আতাউস সামাদ

আতাউস সামাদ  বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক লাভ করেন।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন

তার জন্ম ১৯৩৭ সালের ১৬ নভেম্বর ময়মনসিংহে।

মাতৃভূমি কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার সতেরদরিয়া গ্রামে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিলাভের পর ১৯৫৯ সালে সাংবাদিকতা শুরু করেন। 

উনার স্ত্রীর নাম কামরুন্নাহার রেনু। তিনি দীর্ঘদিন প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশে (পিআইবি) কর্মরত ছিলেন।

তিনি এক ছেলে ও দুই মেয়ের জনক।

আতাউস সামাদ এর কর্মজীবন

১৯৫৯ সালে সাংবাদিকতা শুরু করেন তিনি। ১৯৬৯ ও ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টের (ইপিইউজে) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান অবজারভারের চিফ রিপোর্টারের দায়িত্ব পালন করেন। 

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে কাজ শুরু করেন।

এ ছাড়া তিনি ১৯৮২ সাল থেকে টানা ১২ বছর বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস নিউজের বাংলাদেশ সংবাদদাতা ছিলেন।

সর্বশেষ তিনি দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক ছিলেন। 

এছাড়া তিনি সাপ্তাহিক ‘এখন’ এর সম্পাদক ছিলেন। বেসরকারি টেলিভিশন এনটিভি’র নির্বাহী প্রধান হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও কাজ করেছেন।

আতাউস সামাদ 

তিনি (১৯৩৭-২০১২)  সাংবাদিক, ১৯৩৭ সালের ১৬ নভেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার সতের দরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

বাবার নাম আবদুস সামাদ ও মা সায়েরা বানু।

তার ছাত্রজীবন কেটেছে জলপাইগুড়ি, সিলেট, বরিশাল, রাজশাহী এবং ঢাকায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স এবং ১৯৬০ সালে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন।

এসময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের প্রচার-সম্পাদক হিসেবে হল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেন।

তার সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি ১৯৫৬ সালে সচিত্র সন্ধানীতে। ১৯৫৯ সালে তিনি দৈনিক আজাদ পত্রিকায় সাব এডিটার নিযুক্ত হন এবং ১৯৬১ সালে উক্ত পত্রিকার রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেন।

১৯৬২ সালে তিনি পাকিস্তান অবজার্ভার পত্রিকায় যোগ দেন এবং ১৯৬৯ সালে প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন।

১৯৭০-৭১ সময়কালে তিনি করাচির দি সান পত্রিকার পুর্ব পাকিস্তান শাখার ব্যুরো চিফ ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) যোগ দেন।

তিনি দিল্লিতে বাসসের বিশেষ প্রতিনিধি (১৯৭২-১৯৭৬) এবং বাংলাদেশ টাইমস-এর বিশেষ প্রতিনিধি (১৯৭৮- ১৯৮২) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এছাড়াও আতাউস সামাদ

দীর্ঘ একযুগ (১৯৮২-৯৪) তিনি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের বাংলাদেশ সংবাদাতা ছিলেন।

তিনি দুই মেয়াদে (১৯৭৯-৭০) পুর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের (ইপিইউজে) সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন এবং এ সময় সভাপতি ছিলেন লেখক ও সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগে খন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘ ২০ বছর।

অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক এখন পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন তিনি।

২০০৪ সালে আতাউস সামাদ দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় উপদেষ্টা-সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন এবং জীবন অবসান পর্যন্ত এ পদে বহাল ছিলেন।

তিনি,

উপদেষ্টা-সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ২০০৭ সালে তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবেও কিছুকাল দায়িত্ব পালন করেন।

দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনে তিনি নিয়মিত নিবন্ধ, প্রবন্ধ ও কলাম লিখেছেন যথাক্রমে পাকিস্তানের দৈনিক মুসলিম, কুয়েতের দৈনিক আরব টাইমস্,

লন্ডনের সাউথ ম্যাগাজিন ও ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর, এবং এদেশের সাপ্তাহিক যায়য়ায় দিন, দৈনিক প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ, সমকাল ও যুগান্তরসহ আরো অনেক পত্রিকায়।

তাঁর লেখা গ্রন্থ এ কালের বয়ান, সব কালের বয়ান হিসেবেই পাঠকের কাছে সমাদৃত।

পেশাগত কারনে তিনি ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, তুরস্ক, কুয়েত,

সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সেইন্ট লুশিয়া, আর্জেন্টিনা, লিবিয়া মিশর, বার্মা প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেন।

রাজনীতিতে সক্রিয় ভুমিকা পালন না করলেও রাজনীতিক ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী তিনি।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম রিপোর্টার ছিলেন।

তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মওলানা ভাসানীর মধ্যে প্রায়স যোগাযোগের মাধ্যম ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে সাংবাদিক হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন।

এছাড়াও

এ সময় তিনি ঢাকাতেই আত্মগোপন অবস্থায় ছিলেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নানা কাজে সহায়তা করেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারত থেকে দেশে ফেরার পথে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিমান-সঙ্গী ছিলেন, সে-সেময় তিনি তাঁর একটি মূল্যবান সাক্ষাৎকার নেন।

এছাড়াও তিনি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস নিউজ-এর জন্য সংবাদদাতা হিসেবে ঢাকায় কাজ শুরু করেন মার্শাল ল’ চলাকালিন ১৯৮২ সালের অক্টোবর থেকে।

এই সময় তাঁর প্রতিবেদন মানুষকে প্রকৃত তথ্য জানাতে সাহায়তা করে। তাঁর সাহসিক রিপোর্ট সামরিক সরকারকে অনেক ক্ষেত্রেই বিব্রত করে তোলে।

এসময় বিবিসি ‘হাসিনা অন্তরীণ: খালেদা আত্মগোপনে:

জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের হুঁশিয়ারি’ এবং ‘অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারী’ শিরোনামে দুটি প্রতিবেদন সম্প্রচার করে।

এ সময়ে নিরাপত্তার জন্য আরো অনেক সাংবাদিকের মতো আতাউস সামাদ আত্মগোপনে চলে যান এবং আত্মগোপনে থেকেও নিয়মিত বিবিসিকে গণঅভ্যুত্থানের ও সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করেন।

বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ (এরশাদ-বিরোধী) পরিবেশনের কারণে ১৯৮৭ সালে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।

১৯৯৪-৯৫ সালে নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ নিরসনে দুই নেত্রীকে আলোচনায় বসানোর চেষ্টায় তাঁর ভুমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

সত্য প্রকাশে আপোষহীন আতাউস সামাদ সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাংবাদিকদের দাবি আদায়ের সংগ্রামেও নিজেকে যুক্ত করেছেন এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আজীবন লড়ে গেছেন।

বস্ত্তনিষ্ঠ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক আতাউস সামাদ জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসন, জেনারেল ইয়াহিয়া খানের যুদ্ধ ও গণহত্যা, ১৯৭৫-এ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জারিকৃত জরুরি অবস্থা, ১৯৭৬-এর আগস্টে নিজদেশে জারিকৃত সামরিক শাসন, ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসন, ৯০ এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৯২ সালে শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল-বিরোধী-আন্দোলনসহ সব রকম সংকটময় পরিস্থিতিতে নিরলসভাবে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করেন।

অর্থাৎ যুদ্ধ, সেন্সরশিপ, সামরিক শাসন ও অগণতান্ত্রিক জরুরি অবস্থার মধ্যে দিয়ে তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনের প্রায় সবটা সময় কেটেছে।

পুরষ্কার

সাংবাদিকতায় গৌরবময় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৯২ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। এছাড়াও তিনি বাংলা একাডেমী ফেলোশিপ, বেগম জেবুন্নেসা ও কাজী মাহবুব উল্লাহ জনকল্যান ট্রাস্ট পুরস্কার, মহাকাল সৃষ্টি চিন্তা সংঘ কর্তৃক ভাষা শহীদ গোল্ড মেডেল, জাগৃতি চলচ্চিত্র পরিষদ কর্তৃক শিল্পী কামরুল হাসান স্মৃতি পদক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী জাতীয় স্মৃতি পরিষদ কর্তৃক শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোল্ড মেডেল এবং ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিয়ন কর্তৃক মুক্তিযোদ্ধা রিপোর্টার্স পদকে ভূষিত হন। তাঁর মৃত্যু ঢাকায়, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১২।

আতাউস সামাদ এর পুরস্কার ও সম্মাননা

সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক লাভ করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here