ঘোড়াউত্রা নদী বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিশোরগঞ্জ জেলার একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ৩৩ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৪৩৯ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। 

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা “পাউবো” কর্তৃক ঘোড়াউত্রা নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদী নং ২৬.

ঘোড়াউত্রা নদীর উৎপত্তি

ঘোড়াউত্রা নদীর উৎপত্তি হয়েছে কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলার ধনু নদী থেকে।

উৎপত্তির পর দক্ষিণমুখো হয়ে এই জেলারই বাজিতপুর উপজেলায় মেঘনা ও কালনীর সঙ্গমে মিলিত হয়েছে।

মিঠামইন থেকে বেরিয়ে এটি নিকলী উপজেলা শহরের পূর্ব পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

অন্যান্য তথ্য

নদীর তীরে গড়ে উঠেছে মিঠামইন উপজেলা। নদীটিতে জোয়ার ভাটার প্রভাব রয়েছে, তবে লবণাক্ততা নেই। নদীতে সারাবছরই পানি থাকে। নদী তীরবর্তী এলাকাগুলো সাধারণত বন্যায় প্লাবিত হয় না। পানির গড় গভীরতা শুকনো মৌসুমেও ১০ মিটারের কম নয়। আর বর্ষা মৌসুমে বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ মিটারে। এই নদীর গভীরতা ১৭ মিটার। নদী অববাহিকার আয়তন ১৬১৯ বর্গকিলোমিটার।

ঘোড়াউত্রা নদীর নাম যেভাবে এসেছে

ধনু/ঘোড়াউত্রা/বাউলাইঃ ধনু মেঘনার উপনদী। অপর নাম বাউলাই।

এটি সুনামগঞ্জ থেকে সোজা দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুরী হয়ে কিশোগঞ্জের ইটনা থানায় প্রবেশ করেছে।

মিঠামইন এবং নিকলীর নিকট এ নদী ঘোড়াউত্রা নামে পরিচিত।

ঘোড়াউত্রা নদীর ভাঙ্গন রোধ

কিশোরগঞ্জ জেলার ভাটি অঞ্চলে অবস্থিত একটি খরস্রোতা বৃহৎ নদী ঘোড়াউত্রা।

নদীটি ইটনা, মিটামাইন, নিকলী, বাজিতপুর ও কুলিয়ারচর উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভৈরবের সন্নিকটে মেঘনা নদীতে পতিত হয়েছে।

উজানের বেশ কয়েকটি নদী মিলিত হয়ে ঘোড়উত্রা নাম ধারণ করে একটি বৃহৎ নদীতে পরিণত হয়েছে।

কয়েকটি সূত্রের তথ্যমতে এ নদীর গতিপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৫ কি:মি:।

বেশ কয়েকটি বৃহৎ হাওর, জনপদ বা অঞ্চল পাড়ি দিয়ে বয়ে চলেছে এ নদী।

এক সময়ে উজানে এর নাম ছিল বাউলাই।

এর অপর একটি শাখা ধনু নামে অষ্টগ্রাম উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মেঘনা নদীতে পতিত হয়েছে।


অন্তত হাজার বছর ধরে ঘোড়াউত্রা নদীর প্রবহমানতার কথা স্মরণ করা যায়।

আদিতে ভাটি অঞ্চল বা হাওরঅঞ্চল ছিল কালীদহ সায়রের অংশ। ধীরে ধীরে এসব অঞ্চলে নদী বাহিত পলি ও বালি সঞ্চিত হয়ে জেগে উঠে সমতলভূমি।

এ ভূমিতে সৃষ্টি হয় অসংখ্য নদী। তাদেরই একটি এই ঘোড়াউত্রা ।

এই নদীর তীরে গড়ে উঠেছে শত শত গ্রাম-জনপদ। এসব জনপদের মানুষজন আদিতে কৃষি ও মৎস্যজীবী।

প্রাকৃতিক জীবন নির্ভর এসব পেশাতেই তারা এক সময় বেশ সমৃদ্ধ স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন যাপন করেছে। কিন্তু বর্তমানে তারা আছে নানাবিধ সমস্যায় ।

যুগের পরিবর্তনে, প্রতিনিয়তপ্রাকৃতিক প্রতিকূলতায় এসব সমস্যা এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে।

এখানে অধিকাংশ মানুষ এখন দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করছে।

আবাসন, শিক্ষা, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান, চিকিৎসা মৌলিক চাহিদার সব দিক থেকেই এখানকার মানুষ বঞ্চিত।

তার সাথে যুক্ত হয়েছে প্রায় প্রতিকারহীন নিত্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বিশেষত অকাল বন্যায় ফসলহানী, বর্ষার জলোচ্ছ্বাসে নিত্য ক্ষয়ক্ষতি, নদী ভাঙ্গন প্রভৃতি প্রায় লেগেই আছে।

এছাড়াও

বিশেষত খরস্রােতা ঘোড়াউত্রা নদীর ভাঙ্গনে এ অঞ্চলের প্রায় চার পাঁচটি উপজেলার মানুষজন ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

যা দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের মানুষদের জীবনযাত্রাকে অস্থিতিশীল করে রেখেছে।

অভিজ্ঞমহলের মতে তার আশু সমাধান প্রয়োজন। নদী বিশেষজ্ঞদের মতে নদী তার তীরবর্তী জনপদ ভাঙ্গবেই। তবে নদীর গতিপথ যদি সোজা হয় , সে নদীর ভাঙ্গনহয় সামান্য।

কিন্তু নদী যখন বাঁক নেয় তখন এর গতিপথে বাধার সৃষ্টি হয়। ফলে নদী তার তীরবর্তী জনপদ ভাঙ্গে বিপুল গতিতে।

আদিতেই ঘোড়উত্রা একটি খরস্রােতা নদী। এ নদীতেও কালক্রমে বেশ কয়েকটি বাঁকের সৃষ্টি হয়েছে,যার ফলে বহু স্থানে নদী ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারণ করেছে।

তীরবর্তী গ্রাম ও ফসলি জমি নদী গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় কৃষি ও মৎস্যজীবী মানুষের জন্যে এটি একটি বড় রকমের ক্ষতি।

কেননা এখানকার অনেক মানুষেরই সামান্য একটু ভিটাবাড়ি অথবা কৃষি জমিই ভরসা।

সেটুকু নদীতে ভেঙ্গে গেলে তারা সর্বসান্ত হয়ে পড়ে। বাঁচার অবলম্বনটুকু হারিয়ে ফেলে।

এসব মানুষেরাই শেষে গ্রাম ছেড়ে শহরের বস্তিতে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। দেখা যায় এমনটিই ঘটছে এ অঞ্চলের মানুষের ক্ষেত্রে।

তারপর

একজন নদী বিশেষজ্ঞের ভাষ্যমতে, ড্রেজিয়ের মাধ্যমে নদীর বাঁক নেয়া অংশ সোজা করে দেয়া হলে এর দুই পাড়ের ভাঙ্গন সহনীয় মাত্রায় চলে আসে।

স্রােতেরগতি বাধা না পেলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহও ঠিক থাকে। যার ফলে অকাল বন্যা ও ফসলহানী রোধ করা সম্ভব হয়। ঘোড়াউত্রা নদীর বাঁক নেয়া অংশটিও খুব দীর্ঘ নয়।

এই অল্প কিছু এলাকা ড্রেজিং করে নদীর গতিপথ স্বাভাবিক করে দেয়া গেলে অত্র অঞ্চলের মানুষ ব্যাপক উপকৃত হতো। ফলে এই হাওর এলাকায় উন্নয়নও ঘটতো যথেষ্ট পরিমাণে।

বিভিন্ন তথ্য উপাত্তে জানা যায়, আজ থেকে ষাট বা সত্তর বছর পূর্বেও এ অঞ্চলের মানুষ দুটি ফসল করতে পারতো অনায়াসে। বোরো ধানের পরে পাট ও বর্ষাল ধান ফলতো।

বর্ষাকালে এখন যেখানে ২০ বা ৩০ ফুট পানি থাকে হাওরে, সেকালে এখানে দুই থেকে তিন ফুটের বেশি পানি হতো না।

ময়মনসিংহ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত যে রেললাইন স্থাপিত হয় তার ফলে এ অঞ্চলের শত শত সংযোগ নদী মৃত নদীতে পরিণত হতে থাকে।

বিশেষত আদি খরস্রােতা ব্রহ্মপুত্রের সাথে যে নদীসমূহ সংযোগ নদী রূপে ছিল সেগুলো কালক্রমে মৃতনদী বা বিলীন নদীতে পরিণত হয়।

এর মধ্যে নরসুন্দা বা তেজখালী নদীর কথা বলা যায়। এ নদীগুলো ঘোড়াউত্রা নদীর সঙ্গে ব্রহ্মপুত্রের সংযোগ রূপে কাজ করতো।

রক্ষা করতো নদীর পানি প্রবাহের স্বাভাবিকতা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here